||আমার দিদা||
আমার ঠাকুমা আমার জীবনের একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। অনেক দিন ধরে ইচ্ছা ছিল ওনাকে নিয়ে আমার কাটানো সময়ের কথা লিখে রাখা। পাঁচটি গল্প লিখেছি প্রথম অধ্যায়ে, যাতে ওনার অনুপস্থিতিতে ও ওনাকে কাছে পাই। আশাকরি ভাল লাগবে।।
।।আমার দিদা।।
পর্ব: ১
আমার জন্মের আগে আমার "দিদা" মারা যান। শোকাতুর মা কে ডেকে একদিন ঠাকুমা আদর করে বলেছিলেন যে তোর মেয়ে আমাকে "দিদা" বলেই ডাকবে, আমি ওকে দিদার অভাব বোধ করতে দেব না কখনো।
কথা রেখেছিলেন। জীবনের শেষ দিন অবধি "আমার দিদা" ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু।
পর্ব: ২
আমার দিদা বেশ মজার মানুষ ছিলেন। অনেক সময়ে নিজের অজান্তেই এমন অনেক কাণ্ড ঘটাতেন, তাতে আমরা হেসে গড়াগড়ি খেতাম কিন্তু তিনি নিজে থাকতেন অবিচলিত কখনো বা স্মিতহাস্য।
সে অনেক দিন আগেকার কথা। আমি নেহাতই তখন শিশু। সপরিবারে দিল্লি থেকে বেড়িয়ে ফেরত আসার দিনের ঘটনা। তখন আবার এখনকার মতন এ সি কামরার চল ছিলনা, স্লিপার ক্লাস ই ছিল ভরসা। দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর যখন সবাই দিবানিদ্রা দিচ্ছে, দিদা তখনও জেগে, ছটফটে মানুষ হলে যা হয় আর কি। যাইহোক, ট্রেন কানপুর স্টেশনে দাড়াতে তিনি টাটকা পেয়ারা দেখে সবার জন্য কিনলেন এবং কিছুক্ষণ পরে তার মধ্যে দুটি পেয়ারা পচা বেরোতে আবার হকারকে ডেকে ফেরত দিলেন। কিন্তু, সবার দৃষ্টি আকর্ষিত হল, দিদা আর হকারের বচসাতে-
- মাঈজী, উও হাম নেহি থে, কোই অউর থা।
-আরে তুম হি তো ছিলে, সব পচা পেয়ারা দিয়া। বাচ্চারা কেইসে খায়গা?
এই কথোপকথনে সবার ঘুম মাথায় উঠলো এবং জানা গেল কানপুর স্টেশনে কেনার পরে পেয়ারায় দিদা এতটাই মনোনিবেশ করেছিলেন যে তাঁর খেয়াল ই ছিলনা যে কখন কানপুর পেরিয়ে ট্রেন পরের স্টেশনে পৌঁছে গেছে। বুঝতে পারার পরে সেই হকারের থেকেই পেয়ারা বদল করে আর তাকে হাসিমুখে বিদায় দিয়ে, দিদা র মুখে ছিল যুদ্ধজয়ের হাসি।
বি:দ্র: সেই দিল্লি যাত্রা র একটি ছবি, পুরোনো album থেকে পাওয়া।
পর্ব: ৩
আমার দিদার রান্না ছিল স্বাদে, গন্ধে অতুলনীয়। মা এর মুখে দিদার সাথে রান্না করার অনেক গল্প শুনেছি, যেমন এক একটা রান্না কিভাবে ধরে ধরে শেখাতো মা-জেঠিমাকে, ভুল হলে কিভাবে শুধরে দিত, মা-জেঠিমার দিদার সাথে খুনসুটি- তার কিছুটা অবশ্য আমার নিজের চোখেও দেখা। মনে আছে, রোববারের খাসি মাংসের ঝোলের সাথে ফাউ হিসেবে পাওয়া ছোট একটা টুকরো মাংসের জন্য সারা সপ্তাহ অপেক্ষা করতাম এবং সেই অভ্যেস কে এখনো আমার পিছু ছাড়তে দিইনি। কত রকমের পিঠে পুলি, তরি তরকারির স্বাদ সাধারণ পদ্ধতিতেও হয়ে উঠতো অসাধারণ, তুলনাহীন। দিদার সান্নিধ্যে দীর্ঘদিন থাকার জন্য মা এর অনেক রান্নায় এখন অবশ্য দিদার গন্ধ পাওয়া যায়, শুধু তাই নয়, রান্নার প্রতি আমার আগ্রহ গড়ে তোলার পিছনেও কিন্তু ছিল ওনার ই অবদান।
আমি ছোট থেকেই একগুঁয়ে, নিজে মন থেকে না চাইলে শত চেষ্টা করেও সেই কাজ করানো যায় না। আমার দিদার আবার আমাকে পটিয়ে কাজ করিয়ে নেবার এক অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল- হয়তো দিদাদের মধ্যেই সেই অদ্ভুত ম্যাজিক্যাল ব্যাপার থাকে, যা সবার মধ্যে থাকে না। আমি কিন্তু কলেজে পড়াকালীন রান্নাবান্নার চেয়ে কব্জি ডুবিয়ে খাওয়াতে বিশেষ পটু ছিলাম। তাছাড়া বাবার হুকুমে আমার রান্নাঘরে রান্না করার বিশেষ অনুমতি ছিলোনা ছোট বেলা থেকেই। স্বভাবতই: বাবার হুকুম আর ফাঁকিবাজিকে সঙ্গী করে অনেক ভাবে রান্নাঘরের পথকে এড়িয়ে যাওয়া যেত। কিন্তু সবসময় তো আর ভাগ্য সাথে থাকে না, সুতরাং না চাইতেও যে কাজটা সবচেয়ে অপছন্দের সেই কাজই করতে আমাদের বাধ্য হতে হয়। আমার সাথেও ঠিক তাই ঘটল যখন মা হল একবার অসুস্থ। স্বাভাবিকভাবেই আমার চোখের সামনে অন্ধকার। এই অবস্থায়, অসুস্থ শরীর নিয়ে ও দিদা এগিয়ে এলো আমাকে উদ্ধার করতে, হাতে ধরে শেখাল মুসুরির ডাল, বাঁধাকপি রান্না করার পদ্ধতি। সেই ছিল আমার রান্নার হাতেখড়ি। রান্নার সাথে উপরি ছিল অনেক টোটকা আর কত রকমের হেঁসেলের গল্প, যার বেশীরভাগ মেনে চলা আজও অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গেছে। পরবর্তীকালে, নতুন নতুন রান্না গুলো যত বাজে খেতেই হোকনা কেন, দিদা ছিল আমার প্রথম টেস্টার আর আমার বানানো চাউমিন ছিল দিদার সবচেয়ে প্রিয়। এখন সত্যিই মনে হয়, সেইদিন ওই মানুষ টা না থাকলে তখন আর আমার রান্না শেখা হতনা, সে যুগে তো আর ইউটিউব ছিল না।
আজ ও যখনই নতুন কিছু রান্না করি , তখনই মনে হয় এই তো আমার পাশেই দিদা হাসি মুখে দাঁড়িয়ে বলছে - "কি বানাচ্ছিস রে?" উত্তর দিতে ইচ্ছে করে "এই তো বিরিয়ানি, চাঁপ, রসগোল্লা কত কি! "
পর্ব- ৪
বাঙালির পোস্ত প্রীতি তো সর্বজনবিদিত।
আচ্ছা বলুন তো, পোস্ত দিয়ে আমরা আজকাল ঠিক কটা রান্না করি? এই ধরুন, আলু পোস্ত, নিদেন পক্ষে চিংড়ি পোস্ত, মাছের ঝাল আর বিশেষ কোন দিন হলে পোস্ত বড়া,এখন অবশ্য পরীক্ষা মূলক রান্নার জন্য আমরা মাংস তেও পোস্ত দিই। এবার ফিরে যাই আমার দিদার পোস্ত প্রীতি র গল্পে। এখানে বলে রাখা ভালো, তিনি নিজে কিন্তু পোস্ত দেওয়া খাবার বিশেষ পছন্দ করতেন না অথচ বাড়ীতে সারাবছর কৌটো ভর্তি করে পোস্ত ঠিক মজুত থাকত। আমাদের বাড়ীর নিয়ম অনুসারে জন্মদিনের খাওয়ায় পাঁচ রকম ভাজা দেওয়া হয়, তাতে অনেক কিছুর সাথে একটা প্রমাণ আকারের পোস্ত বড়া অবশ্যই থাকত। এখন অবশ্য সে সব ইতিহাস। দিদা সময় বিশেষে পোস্ত দিয়ে সবচেয়ে বেশি যা যা বানাতেন তার নমুনা খানিকটা এরকম- আলু পোস্ত, ঝিঙে পোস্ত, আলু ঝিঙে পোস্ত, কুঁদরি পোস্ত, পটল পোস্ত, বেগুন পোস্ত, সীম পোস্ত, ঢেঁড়স পোস্ত, সুক্তো তেও পোস্ত শুধু তাই নয়, চিংড়ি আলু পোস্ত, ইলিশ সর্ষে-পোস্ত, মৌরলা সর্ষে-পোস্ত, বাটা সর্ষে-পোস্ত, মাছের ঝালে ও পোস্ত। এখানেই শেষ না, পটলের দোরমাতেও পোস্ত আবার আলু ভাজাতেও পোস্ত, পোস্ত বড়াতে ও পোস্ত আবার পোস্ত ভাপাতেও পোস্ত। পোস্ত কিনতে গেলে এখন মনে হয়, দিদা এ যুগে আমাদের সাথে থাকলে মনের দুঃখে রান্না করাই বোধহয় ছেড়ে দিত, পোস্ত র যা আকাশছোঁয়া দাম। ।
পর্ব- ৫
সারাদিনের সংসারের কাজ কর্মের পরে ক্লান্ত মা তার মেয়ে আর ছেলেকে নিয়ে যখন সবেমাত্র দু চোখের পাতা এক করত, সেই সময় ভাই আর তার দিদি অধীর আগ্রহে বসে থাকত দিদার অপেক্ষায়। কখন দিদা-দাদুর ঘরের দরজা খোলার শব্দ হবে, আর হবে তাদের বন্দীদশার মুক্তি। আমার দিদা ছিল বাংলা সিনেমার পোকা।"সাড়ে চুয়াত্তর" থেকে "বাবা কেন চাকর", হেন কোন সিনেমা ছিল না যা তাঁর দেখা নয়। দুপুর তিনটে বাজলেই হল, তাঁকে আর ঘরে আটকে রাখা যেতনা। অর্থাৎ তিনটে বাজার সাথে সাথে নাতনী-নাতি আর তাদের দিদার টিভি দেখার মিলিত সফর শুরু হয়ে যেত। সেই সময়ের সুযোগ ও নিতাম আমি আর ভাই। সত্যি কথা বলতে গেলে, মফস্বল শহরের একটি একান্নবর্তী পরিবারে জন্ম এবং বড় হবার জন্য সবরকম সিনেমা দেখার অনুমতি ছিল না। মনে পড়ে জ্ঞান হবার পরে আমার প্রথম "হলে" বসে সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতা হয় দাদু দিদার সাথেই। "গুপি বাঘা ফিরে এল" দেখতে গেছিলাম সেদিন। সেই সময় পারিবারিক সিনেমাও আমাদের বড়দের তত্ত্বাবধানে দেখতে হত।।যাইহোক, দিদার সাথে সিনেমা দেখতে বসা মানে, রিমোট কন্ট্রোল থাকবে আমাদের হাতে আর সিনেমার ব্রেক হলেই যাওয়া হবে "এ টি এন", "ই টি সি", "এম টি ভি" বা "কার্টুন নেটওয়ার্ক"। মা ঘুম থেকে ওঠার সময় হলেই আবার রিমোট চলে যেত দিদার কাছে, ভাল মেয়ের মতন দিদার আঁচলের তলায় লুকিয়ে পড়তাম, মায়ের বকুনি র ভয়ে। দিদা বরাবর তৈরি থাকত আমাদের উদ্ধার করার ফিকির নিয়ে।একটা নিশ্ছিদ্র আশ্রয় ছিল দিদার সেই আঁচল। পরবর্তী কালে পড়াশোনা র জন্য ভোরবেলায় ডেকে দেওয়া থেকে শুরু করে পাশে বসে ভূগোলের প্র্যাকটিক্যাল খাতা বানানো, সবসময় বট গাছের মত আঁকড়ে ধরে থেকেছে দিদা, শেষ সময় অবধি। নিঃস্বার্থ ভালবাসা আর স্নেহের মায়াজালে আবদ্ধ করে রাখা "দিদা" নামের সেই আশ্রয়, সেই শাড়ির আঁচল টা আমি এখনও জীবনের সব কঠিন সময়গুলোতে খুঁজে বেড়াই। মাঝে মাঝে অবশ্য স্বপ্নে এক ঝলক দেখা দিয়েও বুঝিয়ে দেয় "এই তো আছি রে আমি"।
প্রসঙ্গত, আমি লেখা লেখি সাধারণত গভীর রাত্রে করি। যেদিন পঞ্চম পর্বটি লিখছি, হয়তো কোন কারণে মন ভারাক্রান্ত ছিল বা লেখার মধ্যে দিয়ে স্মৃতিচারণায় মন এতটাই জড়িয়ে গেছে, যে ভোর রাতে এক গাল হাসিমাখা মুখটির দেখা অনেক দিন বাদে পেলাম।
বি:দ্র: যদিও দিদা দাদুরা সবাই মনেই রয়েছেন, তাও চেন্নাই এর বাড়িতে এক ই ফ্রেমে চার জন এভাবেই আমাকে এখনও কড়া নজরে রেখেছে।
©গার্গী ত্রিপাঠী
Comments
Post a Comment